ধরা যাক—ভিনরাজ্যে কাজ খুঁজতে বেরোনো এক বাঙালি দিনমজুর ট্রেনে বসে ফোনে স্ত্রীর সঙ্গে বাংলায় কথা বলছে। হঠাৎ কেউ তাকে জিজ্ঞেস করল, “বাংলা (Bangal) বলছো? বাংলাদেশি নাকি?” তারপরই পুলিশের তাড়া, আটক, আর শেষে ‘পুশব্যাক’ করে সীমান্ত পার করে দেওয়া! শুনে অবাক লাগছে? অথচ গত কয়েক মাস ধরেই এমন অভিযোগই লেগে আছে। আর এবার সেই গুরুতর অভিযোগ নিয়ে সরাসরি কেন্দ্র সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাল দেশের শীর্ষ আদালত।
আদালতে ধাক্কা খেল “বাংলা মানেই বাংলাদেশি” যুক্তি
শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানি চলাকালীন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন—
“কেউ বহু বছর ধরে ভারতে রয়েছে, আর কেউ সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকতে চাইছে—এই দুইকে কীভাবে একই আসনে বসাতে পারেন? শুধু ভাষা এক, মানেই তারা বাইরের লোক? পাঞ্জাবিরা যেমন এপারে আছে, তেমনই ওপারেও আছে—তাহলে কি পাঞ্জাবি মানেই পাকিস্তানি?” আদালতের এই মন্তব্য কার্যত কেন্দ্রের দাবি-তত্ত্বকে ধাক্কা দিল।
দিল্লি পুলিশ, অন্তঃসত্ত্বা মহিলা আর ‘পুশব্যাক’
এই ঘটনার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গ শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের তরফে মামলা আনা হয়। অভিযোগ, দল বেঁধে বাংলার শ্রমিকদের ধরা হচ্ছে এবং সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
মামলায় তুলে ধরা হয় ভয়ঙ্কর ঘটনা—বীরভূমের অন্তঃসত্ত্বা সোনালি বিবি-সহ ছয়জনকে দিল্লি থেকে সরাসরি সীমান্তে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশে গিয়ে তাঁদের গ্রেফতারও করেছে সেখানকার পুলিশ।
অন্যদিকে আবেদনকারীর পক্ষের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ একেবারে সোজা বলেন—“বাংলাদেশ নিজেই বলেছে সোনালি বিবি ভারতীয়। তাহলে একজন ভারতীয় নাগরিক এখন বাংলাদেশি হয়ে গেলেন কীভাবে? এখন এই নারীর কী হবে? তার অনাগত সন্তানের কী হবে?”
সরকারের সাফাই, আদালতের পাল্টা প্রশ্ন
অবশ্য কেন্দ্রের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন—“এগুলো সংবাদমাধ্যমের গল্প, আসল বিষয় হলো ভারতে প্রচুর অনুপ্রবেশ হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এ ব্যবস্থা।” এমনকি উদাহরণ টানলেন আমেরিকার—“ওখানে পাঁচিল দেওয়া, তাই আমাদেরও অনুপ্রবেশ রুখতে হবে।”
কিন্তু তখনই বিচারপতি বাগচীর পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন—“তাহলে কি ভারতও সীমান্তে পাঁচিল তুলতে চায়?”—এই প্রশ্নে পুরো আদালত যেন থম মেরে যায়।
রাজ্য থেকে প্রতিক্রিয়া
এই রায়ের পর্যবেক্ষণ ঘিরে নতুন উদ্দীপনা বাংলার রাজনৈতিক মহলে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টুইটে জানান—
“পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ যুগান্তকারী। বাংলার শ্রমিকরা এর থেকে নতুন ভরসা পাবে। আমি বাংলার শ্রমিকদের পাশে আছি, থাকব।”
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ
অবশেষে আদালত বলেছে—শুধুমাত্র বাংলায় কথা বললেই কাউকে বাংলাদেশি বলা হলে তার সঠিক সত্যতা কেন্দ্রকে প্রমাণ করতে হবে। সেইসঙ্গে গুজরাটে থাকা বাংলার শ্রমিকদের হেনস্তার ঘটনাও মামলায় যোগ করা হয়েছে।