কলকাতার প্রাচীনতম সতীপীঠ কালীঘাট মন্দিরে (Kalighat Mondir) বহু বছর ধরে পান্ডা ও দালালদের আধিপত্য বিস্তৃত, যা পুণ্যার্থীদের জন্য একটি বড় কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মন্দিরের আশেপাশে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ জন দালাল ঘোরাফেরা করেন, যারা দর্শনার্থীদের জোর করে বিদ্যমান ডালার দোকানগুলোতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর সেই দোকান থেকেই পান্ডারা পুজোর দায়িত্ব নেন। দালাল এবং পান্ডাদের এই সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে জন্য প্রশাসন বার বার চেষ্টা করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তারই ফলে পুণ্যার্থীরা বারবার হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এই ‘পান্ডারাজ’ ভাঙার জন্য বিহারের গয়ায় অনলাইনে পিণ্ডদান ব্যবস্থা চালু করা হলেও। কালীঘাট মন্দিরে এই ধরনের ব্যবস্থা এখনও চালু হয়নি। মন্দির কর্তৃপক্ষ আইনি অসুবিধার কথা বলে অনলাইন পুজোর উদ্যোগে আলাপ-আলোচনা করতে চান না। এছাড়াও, অনেক সেবাইত অনলাইনে পুজো দেওয়ার বিরোধিতা করেন, কারণ তাঁদের মতে মায়ের সরাসরি দর্শন ও উপস্থিতি ছাড়া পূর্ণ পুণ্য লাভ সম্ভব নয়।
মন্দির কমিটির সভাপতি জানান, “ব্যক্তিগত অনুরোধের ভিত্তিতে আমরা পুজোর বন্দোবস্ত করতে পারি, তবে সার্বিক অনলাইন পুজো ব্যবস্থা এখনও নেই। আদালতের নির্দেশে মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব টেম্পল কমিটির, কিন্তু পুজো সম্পাদনের কাজ সেবাইতদের হাতে থাকে, যা আইনগত জটিলতা সৃষ্টি করে।” তাই স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইনি জটিলতা মিলে কালীঘাটে অনলাইন পুজোর বাস্তবায়ন কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, দুইটি পান্ডা সংগঠন এ বিষয়ে মুখ বুজে আছে, কারণ তাদের পরিচালনার মূল চাবিকাঠি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার হাতে।
পান্ডারা জানান, তাঁদের কোনোদিনই নির্দিষ্ট বেতনের সুবিধা ছিল না , তাই ভক্তদের থেকে প্রাপ্ত দক্ষিণাই তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। তারা সতর্ক করেন, অনলাইন ব্যবস্থা চালু হলে আয় বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কায় তাঁদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। দালালদেরও একই বক্তব্য, দোকানে পুজো না হলে তাঁদের কোনো কমিশন মেলে না, ফলে তাঁদের রোজগারে প্রবল প্রভাব পড়বে।
গত কয়েক বছর মন্দির চত্বর সংলগ্ন পান্ডাদের দোকানগুলো ভেঙে দেওয়া হলেও তাঁরা নতুনভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন। তবে পুলিশি দমন ও নতুন নিয়মের কারণে পরিচিত যজমানদের খোঁজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এই প্রথাগত পান্ডা-দালাল রাজত্ব ভাঙতে বেশ সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সুতরাং, প্রযুক্তির সুযোগে যদি অনলাইন পুজো কালীঘাট মন্দিরেও চালু হয়, তবে শতাব্দী প্রাচীন পান্ডা-দালালদের আমলাতন্ত্রে একটি বড় ধাক্কা আসবে। তবে তা বাস্তবায়নের পথেও রয়েছে বহু সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনি বাধা।